বিশ্বের সাড়ে চার কোটিরও বেশি মানুষ ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যায় ভুগছেন। অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড শরীরে জমা হলে গাঁটের ব্যথা থেকে শুরু করে কিডনির সমস্যার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই সমস্যার কারণে খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হয়, অনেক প্রিয় খাবার বর্জন করতে হয়। তবে নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। পাশাপাশি কিছু ভেষজ পানীয়ও ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। আয়ুর্বেদে এই ধরনের বেশ কিছু উপকারী পানীয়ের উল্লেখ রয়েছে, যা নিয়মিত গ্রহণ করলে শরীরে জমে থাকা ইউরিক অ্যাসিড সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে।
কেন বাড়ে ইউরিক অ্যাসিড?
ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও ওজন বৃদ্ধি। উচ্চমাত্রার প্রোটিনযুক্ত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত জল না খাওয়া এবং অনিয়মিত জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধি ও মূত্রনালিতে জমতে শুরু করে, যার ফলে প্রস্রাবের সমস্যা, গাঁটের ব্যথা এবং এমনকি কিডনিতে পাথরও হতে পারে।
কীভাবে ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়?
১. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন – উচ্চমাত্রার প্রোটিনযুক্ত খাবার যেমন পাঁঠার মাংস, মুসুর ডাল, সামুদ্রিক খাবার ইত্যাদি কম খেতে হবে। ২. পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন – শরীর থেকে টক্সিন বের করতে দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস জল পান করুন। 3. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন – দৈনিক হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে এবং অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। ৪. ভেষজ পানীয় গ্রহণ করুন – কিছু নির্দিষ্ট ভেষজ পানীয় শরীর থেকে অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড বের করে দিতে সাহায্য করে।
ইউরিক অ্যাসিড কমাতে উপকারী কিছু ভেষজ পানীয়
১. গুলঞ্চের চা
গুলঞ্চ (Tinospora cordifolia) একটি শক্তিশালী ভেষজ, যা শরীরের অতিরিক্ত টক্সিন বের করে দিতে সাহায্য করে। এটি লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা উন্নত করে এবং শরীরে জমে থাকা ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমায়।
প্রস্তুত প্রণালী:
- কিছু গুলঞ্চ পাতা ও ডাল সারা রাত জলে ভিজিয়ে রাখুন।
- পরের দিন সকালে এগুলি গুঁড়িয়ে নিন।
- এক গ্লাস জলে এক থেকে দুই চামচ গুলঞ্চের গুঁড়ো মিশিয়ে ফুটতে দিন ৫-৭ মিনিট।
- জল অর্ধেক হয়ে গেলে ছেঁকে পান করুন।
২. ত্রিফলা চা
ত্রিফলা তিনটি শক্তিশালী ভেষজ ফল – আমলকি, হরিতকি এবং বহেরার মিশ্রণ। এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে শরীরের টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে এবং হজম ক্ষমতা উন্নত করে।
প্রস্তুত প্রণালী:
- এক চামচ ত্রিফলা গুঁড়ো এক গ্লাস জলে সারা রাত ভিজিয়ে রাখুন।
- সকালে খালি পেটে সেই জল পান করুন।
- বিকল্পভাবে, এক কাপ জলে এক চামচ ত্রিফলা গুঁড়ো মিশিয়ে তা ৫ মিনিট ফুটিয়ে নিন।
- ছেঁকে নিয়ে পান করুন।
- রাতে শোয়ার আগে এই পানীয় গ্রহণ করলে ঘুম ভালো হবে এবং শরীরে টক্সিন জমতে পারবে না।
৩. নিম-তুলসীর রস
নিম ও তুলসী উভয়ই শক্তিশালী ডিটক্স উপাদান। এই দুটি ভেষজ শরীরে প্রদাহ কমায়, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং লিভার ও কিডনির স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
প্রস্তুত প্রণালী:
- এক মুঠো নিম পাতা ও তুলসী পাতা ভালো করে ধুয়ে নিন।
- এক কাপ জলে ৫-৭ মিনিট ধরে ফুটিয়ে নিন।
- ঠান্ডা হলে ছেঁকে নিয়ে পান করুন।
- প্রতিদিন সকালে এই পানীয় পান করলে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমবে।
৪. ধনে ভেজানো জল
ধনে বীজে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরের প্রদাহ কমায় এবং কিডনির কার্যক্ষমতা বাড়ায়। ধনে ভেজানো জল পান করলে হজম শক্তি বাড়ে, ওজন কমে, এবং শরীরের অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড নির্গত হয়।
প্রস্তুত প্রণালী:
- এক চা চামচ ধনে বীজ এক গ্লাস জলে সারা রাত ভিজিয়ে রাখুন।
- সকালে সেই জল ছেঁকে খালি পেটে পান করুন।
- নিয়মিত এই জল পান করলে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, গুলঞ্চের চা, ত্রিফলা চা, নিম-তুলসীর রস এবং ধনে ভেজানো জল শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড নির্গত করতে বিশেষভাবে কার্যকর। নিয়মিত এই পানীয় গ্রহণ করলে কেবল ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হবে।
সতর্কতা: এই ভেষজ পানীয় গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, বিশেষ করে যদি আপনার অন্য কোনো রোগ থেকে থাকে বা ওষুধ গ্রহণ করেন।